
শ্যামনগর প্রতিনিধি: বিকেলের নরম রোদ পড়েছে সবুজ ধানখেতে। পাশে একটি কালভার্ট। সেখানে কোথাও বন্ধুদের বসার ছোট বেঞ্চ, কোথাও দোলনা। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ সেলফি কর্নারে দাঁড়িয়ে ধরে রাখছেন প্রিয় মুহূর্ত। জায়গাটির নাম তাই ‘শেষ বিকেলের চায়ের আড্ডা’।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কচুখালীতে কালভার্টের পাশে বাঁশ, কাঠ ও খড় দিয়ে তৈরি হয়েছে এই টংঘর ক্যাফে। মুনসুর সরদার গ্যারেজ-হরিনগর বাজার সড়কের পাশের এই ক্যাফে গড়েছেন ছয় কলেজশিক্ষার্থী। গত ১৪ অক্টোবর এর উদ্বোধন হয়েছে।
উদ্যোক্তারা হলেন, মুন্সিগঞ্জ কলেজের শিক্ষার্থী মোঃ তায়িব, মোঃ মিলন হোসেন, মেহেদী হাসান, মোঃ বিপ্লব হোসেন, মোঃ ইমন হোসেন ও মোঃ রাকিবুল হাসান। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেরা কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তাঁরা একসঙ্গে কাজ শুরু করেন।
গল্পের শুরু আড্ডা দিয়েই। মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে অবসর সময়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো, শুধু আড্ডা না দিয়ে এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করা যায়। পুঁজি খুব বেশি ছিল না, তবে নিজেদের শ্রম আর ইচ্ছা ছিল। সেই ভরসাতেই ক্যাফেটি গড়ে তুলেছি।’
ছয় বন্ধু প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাঁশ, কাঠ ও খড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণে ঘরটি সাজিয়েছেন নিজেরাই। চাকচিক্যের চেয়ে এখানে গুরুত্ব পেয়েছে সাদামাটা পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ।
ক্যাফেতে চা-কফির পাশাপাশি হালকা খাবারও মেলে। দাম হাতের নাগালে। অপরাজিতা ফুলের চা ২০ টাকা, দুধ চা ২০ টাকা, মালাই চা ২৫ টাকা, ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা, মালাই রুটি ও ফুচকা ৩০ টাকা। সেলফি কর্নার, দোলনা আর কয়েক ধরনের বসার ব্যবস্থা তো আছেই।
উদ্যোক্তাদের ভাবনায় শুধু ব্যবসা নেই, আছে এলাকার পরিবেশও। তাঁদের ভাষ্য, কচুখালীর এই সেতুতে আগে বখাটেদের উৎপাত ছিল। তাঁদের দাবি, মাদকসেবনসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের আড্ডাও বসত সেখানে। সেই পরিস্থিতি বদলাতে এবং জায়গাটিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অবসর কাটানোর উপযোগী করতেই তাঁরা উদ্যোগ নিয়েছেন।
মোঃ মিলন হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, জায়গাটি মানুষের কাছে ভালো একটি স্থান হিসেবে পরিচিত হোক। তরুণেরা এখানে আসবেন, চা খাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। জায়গাটিতে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছয়জন কলেজশিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোগে এমন একটি ক্যাফে গড়ে তুলেছেন, এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাঁরা শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানের কথা ভাবছেন না, এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই উদ্যোগ অন্য তরুণদেরও ইতিবাচক কাজে উৎসাহিত করবে বলে আশা করি।’
তাঁর প্রত্যাশা, ক্যাফের পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রেখে মানুষের আস্থা অর্জন করবেন উদ্যোক্তারা। তিনি বলেন, ‘ছয় বন্ধুর এই ছোট্ট উদ্যোগ একদিন অনেক বড় হবে-সেই আশাই করি।’
ক্যাফেকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আছে ছয় বন্ধুর। তাঁরা জানান, আয় বাড়লে তার একটি অংশ এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করতে চান। তাঁদের স্বপ্ন, ক্যাফেটি শুধু চা আর আড্ডার জায়গা হয়ে থাকবে না; সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোরও মাধ্যম হবে।
মাত্র ৩০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগের সামনে এখন যেমন সম্ভাবনা, তেমনি চ্যালেঞ্জও। ব্যবসাটি কতদূর এগোবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে অবসর সময়কে কাজে লাগানো, এলাকার পরিবেশ নিয়ে ভাবা এবং অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন তাঁরা দেখছেন, সেটিই উদ্যোগটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
মন্তব্য করুন