বাংলাদেশ, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
৬ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২১ অক্টোবর ২০২৬, ১:৪৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে || ‎তারিক ইসলাম

‎‘সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;/ থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

‎বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তীব্র এক আবেশের নাম ‘বনলতা সেন’। মাত্র বারো লাইনের একটি কবিতা, অথচ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে তা বুনে চলেছে এক চিরন্তন রূপকথা। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা ক্লান্ত এক পথিকের একমাত্র আশ্রয় হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নাটোরের এই নারী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এই বনলতা সেন? তিনি কি কবির কল্পনার কোনো মানসকন্যা, নাকি রক্ত-মাংসের কোনো বাস্তব চরিত্র? নাকি রূপক অর্থে জীবনানন্দের পরম প্রশান্তির রূপায়ণ?

‎সাহিত্য গবেষকদের মধ্যে বনলতা সেনের পরিচয় নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। কবির ব্যক্তিগত খাতা ও ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর জীবনে বেশ কয়েকজন নারীর উপস্থিতি ছিল। কেউ বলেন, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দিনগুলোতে কবির পরিচিত কোনো তরুণীই পরবর্তীতে নাটোরের প্রেক্ষাপটে রূপ পেয়েছেন। আবার অনেক গবেষকের মতে, শোভনা বা ‘ওয়াই’ ছদ্মনামের যে নারীর উল্লেখ কবির ডায়েরিতে বারবার এসেছে, তিনিই হয়তো এই বনলতা। তবে তথ্য-উপাত্তের চেয়ে বড় সত্য হলো, জীবনানন্দ তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ে আটকে রাখেননি।

‎বরিশাল থেকে কলকাতা কিংবা দিল্লির নির্জন জীবনপথে কবি বহন করেছেন এক গভীর একাকিত্ব। পৃথিবীর কোলাহল, সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর ঘুরে আসা পথশ্রান্তি শেষে তিনি যে আশ্রয়ের খোঁজ করেছিলেন, বনলতা সেন মূলত সেই শান্তির প্রতীক। নাটোর শহর যেমন ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি ও নীরবতার জন্য পরিচিত, তেমনি ‘নাটোরের বনলতা’ যেন এক চিরন্তনী রূপক, যা স্পর্শ করলে মুছে যায় সমস্ত জরা ও ক্ষয়।

‎আজকের দ্রুতগতি, প্রযুক্তি নির্ভর ও মানসিক অস্থিরতার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন শ্রান্ত পথিক। চারপাশের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নিঃসঙ্গতার মাঝে আমরাও যেন প্রতিনিয়ত একটু নির্ভেজাল প্রশান্তি খুঁজে ফিরি। তাই একুশ শতকে এসেও বনলতা সেনের আবেদন সামান্যতমও কমেনি। তিনি কেবল ১৯৪২ সালে প্রকাশিত একটি কবিতার চরিত্র নন; বরং আধুনিক মানুষের বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর এক স্বস্তির আকুলতা।

‎জীবনানন্দ দাশ তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, জীবনের সব হিসেব-নিকেশ ও লেনদেন শেষে মানুষের আসল প্রাপ্তিটুকু থাকে ভালোবাসায় এবং আত্মিক শান্তিতে। বনলতার চোখের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো’ ছায়া আজও আমাদের ডেকে যায়। তাই বনলতা সেনের খোঁজে কবির যে যাত্রা, তা আসলে একাকী কোনো কবিপুরুষের নয়—তা আমাদের সবারই নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক চিরন্তন প্রয়াস।

লেখক : ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় প্রটোকল ভঙ্গ, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ওএসডি

১

এবার হবে ‘ওয়ার্ম উইন্টার’, শীতের ব্যাপ্তিও কমবে

২

সাতক্ষীরায় অ-১৪ ফ্রি সাঁতার প্রশিক্ষণ শুরু ২৪ অক্টোবর, অংশ নেওয়ার আহবান

৩

জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে || ‎তারিক ইসলাম

৪

তালায় তিন দিনে ৭০পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক হাবিব

৫

টুপটাপ রিসোর্ট ও আমাদের দায়হীনতার সংস্কৃতি || মো. মামুন হাসান

৬

শ্রীউলার ৮টি পূজামণ্ডপে যুবদল নেতা রাফিউলের আর্থিক সহযোগিতা

৭

পয়সা দিচ্ছে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার, অস্থিরতার চেষ্টা করছে আরেক পক্ষ: তারেক রহমান

৮

বিষ্ণুপুরে আট দুর্গামন্দিরে অনুদানের চেক প্রদান

৯

বিসিএসে ২৮তম হয়েও গেজেট বঞ্চিত, হতাশায় নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ঘোষণা

১০

আলিপুরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি উদ্বোধন

১১

সুন্দরবন থেকে হরিণের মাথা ও ভুড়িসহ এক চোরা শিকারী আটক

১২

শার্শায় প্রকাশ্যে পিস্তল প্রদর্শন, এলাকায় আতংক

১৩

নিজ বিদ্যাপীঠ পরিদর্শনে যুগ্ম সচিব ফাতিমা তুজ জোহরা

১৪

সাতক্ষীরা সীমান্তে ৭৮ লাখ টাকার হেরোইন তৈরির কাঁচামাল জব্দ

১৫

কালিগঞ্জে দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে শাড়ি বিতরণ

১৬

সুন্দরবনের ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ, বাড়ছে উদ্বেগ

১৭

নাটোরে বাস-বালুবোঝাই ট্রাক সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১৪ জনের 

১৮

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় মাঠে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি

১৯

দেবহাটায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তারা

২০