
ফরহাদ হোসেন, কয়রা (খুলনা): সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন উপকূলীয় হাজারো জেলে। কিন্তু জীবিকার সেই চেনা জলপথ এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। বনদস্যুদের অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবিতে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সুন্দরবননির্ভর জেলেরা। তাই শুধু দস্যুদের দমন নয়, তাদের পেছনে থাকা মদদদাতাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা এবং জেলেদের নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে খুলনার কয়রায় মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় উপজেলার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের সামনে উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের উদ্যোগে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বনজীবীরা অংশ নেন।
সংগঠনের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান, সেক্রেটারি মাওলানা সাইফুল ইসলাম, কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ.ব.ম. আব্দুল মালেক, সংগঠনের সাবেক আহ্বায়ক মো. আনোয়ার হোসেন, কয়রা বাজার কমিটির সভাপতি সরদার জুলফিকার আলম, সুজনের সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলাম, কপোতাক্ষ কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিদেশ রঞ্জন মৃধা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন, জামায়াত নেতা মাস্টার সাইফুল্লাহ হায়দার, মোল্যা শাহাবুদ্দিন শিহাব ও দ্বীন মোহাম্মদ।
আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মো. কামাল হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, মানবাধিকার ব্যুরো কয়রার সাধারণ সম্পাদক জিএম মোনায়েম বিল্লাহ, কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম, সমাজসেবক আসাদুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি রাসেল আহম্মেদ, ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম আজু এবং স্থানীয় জেলে আবু মুছা, মোসানুর, রবিউল ইসলাম প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে যাওয়া জেলেদের জন্য বনদস্যুদের অপহরণ ও চাঁদাবাজি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জেলেকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দস্যুদের ভয়ে কেউ কেউ জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মাছ ধরা থেকেও সরে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে শুধু জেলেরা নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছেন।
বক্তারা আরও বলেন, বনদস্যুতা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা, অর্থের জোগানদাতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করা জরুরি। এসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা না গেলে দস্যুতা নির্মূলের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
তাঁরা বলেন, সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়, এটি উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বন ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দস্যুদের দমনে নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান, নদী-খালে টহল জোরদার, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধীদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মানববন্ধন থেকে প্রশাসনের প্রতি সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বনদস্যুদের সহযোগীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন বক্তারা।

মন্তব্য করুন