বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৯ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৪০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

দেশে ক্যানসার শনাক্তে জিন প্রযুক্তির ব্যবহার

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে ক্যানসার শনাক্তে জিন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে ঠিকভাবে ক্যানসার শনাক্ত সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাজারে আছে দেশে উৎপাদিত ক্যানসারের ওষুধ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুইয়ের সমন্বয়ে দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।

২৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) জিনোম সিকোয়েন্সিং–ভিত্তিক ক্যানসার শনাক্ত শুরু করেছে। অল্প সময়ে ক্যানসার শনাক্তের প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এ ছাড়া কোনো ওষুধ ক্যানসারের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে থাকলে, তা–ও রোগীকে জানিয়ে দেবে আইসিডিডিআরবি।

দেশে কত মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের একটি সমীক্ষা বলছে, দেশের এক লাখ মানুষের মধ্যে ১০৬ জনের কোনো না কোনো ক্যানসার আছে। অন্যদিকে ক্যানসারের ওপর নজরদারি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবোক্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নানা ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আর প্রতিবছর ক্যানসারে মারা যান ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ।

বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, দেশে ঠিকভাবে রোগ শনাক্ত হয় না। অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক দেশের রোগ শনাক্তের প্রতিবেদনে আস্থা রাখেন না। অনেক রোগীকে ক্যানসার পরীক্ষার জন্য বিদেশে নমুনা পাঠাতে হয়। এতে রোগনির্ণয় প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হয় এবং প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য হয় না।

বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) জিনোম সিকোয়েন্সিং–ভিত্তিক ক্যানসার শনাক্ত শুরু করেছে। অল্প সময়ে ক্যানসার শনাক্তের প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এ ছাড়া কোনো ওষুধ ক্যানসারের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে থাকলে, তা–ও রোগীকে জানিয়ে দেবে আইসিডিডিআরবি।

কী নতুন প্রযুক্তি
ক্যানসার–বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমান যুগে তিনভাবে বা তিন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যানসার শনাক্ত হয়। ইমিউনোহিস্টো কেমিস্ট্রি (আইএইচসি), রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (আরটি–পিসিআর) টেস্ট এবং নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (এনজিএস)। তিনটিই স্বীকৃত পদ্ধতি। ঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে সব কটি থেকে সঠিক রোগ শনাক্ত সম্ভব।

ক্যানসার শনাক্তে আইএইচসি পরীক্ষা বাংলাদেশে বেশি হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তে আরটি– পিসিআর টেস্টের ব্যবহার করোনা মহামারির সময় বেশি হতে দেখা গেছে। তবে এটি ক্যানসার শনাক্তেও ব্যবহার করা হয়।

জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বা এনজিএসের মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তের কাজটি দেশে একেবারে নতুন নয়। একাধিক চিকিৎসক বলেছেন, দেশে দু–একটি পরীক্ষা হয়েছে। মূলত বিদেশ থেকে এনজিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে আনা হয়। এতে খরচ অনেক বেশি পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোষে থাকা জিনের মিউটেশনের (রূপান্তর) কারণে ক্যানসার হয়। মিউটেশন হওয়া কোষগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে। মানুষের শরীরে থাকা কোটি কোটি জিনের মধ্যে ঠিক কোনটিতে এই মিউটেশন হয়েছে, তা এনজিএস প্রযুক্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব। একবার শনাক্ত হলে সেই জিনকে লক্ষ্য রেখে ক্যানসারের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আইসিডিডিআরবির জিনোম সেন্টারের প্রধান মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অত্যাধুনিক এনজিএস যন্ত্র, আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও বিদেশে প্রশিক্ষণ পাওয়া জনবল আমাদের আছে। আমরা আন্তর্জাতিক ও সর্বোচ্চ গুণমান নিশ্চিত করে নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং–ভিত্তিক ক্যানসার শনাক্তের সক্ষমতা অর্জন করেছি। আমরা ক্যানসার চিকিৎসক ও রোগীকে ঠিক সময়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন দিতে পারব। আমাদের উদ্যোগ ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।’

আইসিডিডিআরবির কাগজপত্র বলছে, তারা নমুনা পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পারবে। এই নমুনা মহাখালী, মিরপুর, মতিঝিল, ধানমন্ডি, উত্তরা, নিকেতন, গুলশান ও বারিধারার আইসিডিডিআরবির ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বুথে জমা দেওয়া যাবে। ক্যানসার ভেদে নমুনা পরীক্ষার ফি ১১ হাজার টাকা থেকে ৩৪ হাজার টাকা।

এনজিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তের যে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, সেখানে চিকিৎসাবিষয়ক বাড়তি তথ্যও থাকবে। যেমন শনাক্ত হওয়া ক্যানসার কোন কোন ওষুধে ভালো হয় না বা ঠিকভাবে কাজ করে না, তার একটি তালিকা থাকবে প্রতিবেদনে। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই তালিকা তৈরি করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স–এআই) ব্যবহার করে। তাতে ওষুধের অকার্যকারিতার প্রামাণ্য সূত্র থাকে। এতে রোগীর জন্য ওষুধ নির্বাচন চিকিৎসকের পক্ষে সহজ হয়।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ও স্কয়ার হাসপাতালের ক্যানসার সেন্টারের সমন্বয়কারী অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ক্যানসার রোগীদের জন্য আইসিডিডিআরবির এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তি জিন মিউটেশন শনাক্ত করে, যার মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা অর্থাৎ টার্গেটেড থেরাপি দেওয়া সম্ভব হয়। এতে রোগী অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়াতে পারেন। এটিই ক্যানসার চিকিৎসার নতুন দিগন্ত।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের লক্ষণীয় অগ্রগতি ও উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি বলছে, দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের ৯৮ শতাংশ এখন দেশেই তৈরি হয়। একাধিক ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে—বিকন, এসকেএফ, ইনসেপ্টা, হেলথকেয়ার, স্কয়ার, বেক্সিমকো, জিসকা, এভারেস্ট, রেনেটাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ কিছু কোম্পানি বিদেশেও রপ্তানি করছে। দেশে তৈরি ক্যানসারের ওষুধ নিয়মিত বাজারে আসছে। এতে ক্যানসারের কিছু ওষুধের দাম কমে আসার প্রবণতা দেখা গেছে।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক বলেন, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো বিদেশে ক্যানসারের ওষুধ রপ্তানি করে, এটি সাফল্যের একটি দিক। আবার বিদেশ থেকে অনেকে বাংলাদেশে এসে ক্যানসারের ওষুধ কিনে নিয়ে যান, এমন নজিরও আছে। তারা মনে করেন, কিছু ক্যানসারের ওষুধের দাম বাংলাদেশে কম।

প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও একদিকে দেশে ক্যানসার শনাক্তের নির্ভুল পরীক্ষা–নিরীক্ষার প্রসার ঘটছে। অন্যদিকে ক্যানসারের ওষুধও সহজলভ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও ওষুধ আরও সহজপ্রাপ্য হওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল ও চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ানো দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সমানভাবে প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ কিছু কোম্পানি বিদেশেও রপ্তানি করছে। দেশে তৈরি ক্যানসারের ওষুধ নিয়মিত বাজারে আসছে। এতে ক্যানসারের কিছু ওষুধের দাম কমে আসার প্রবণতা দেখা গেছে।

সার্ক ফেডারেশন অব অনকোলজির মহাসচিব মোস্তফা আজিজ বলেন, ক্যানসারের মতো জটিল রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসার ওষুধ হাতের কাছে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন সবাই মিলে রোগ শনাক্তের পরিধি আরও বাড়ানো, ওষুধ আরও সহজলভ্য করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এসব করা গেলে দেশে ক্যানসার চিকিৎসা উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেপালের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ, চূড়ান্ত সূচি প্রকাশ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ছাত্রদলের নবীন বরণ

তালায় গ্রামীণ সড়কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন বিষয়ক কর্মশালা

মথুরেশপুর ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক হেমায়েত বহিষ্কার

ভারতে সাজাভোগ শেষে দেশে ফিরল শিশুসহ ১৮ বাংলাদেশি

রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে সৌর বিদ্যুৎ চালুর দাবি

ট্রি অফ লাইফ’র উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ

ভারতসহ ১০ দেশের ওপর শতভাগ শুল্কের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

শ্যামনগরে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা ও জলবায়ু ন্যায্যতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ

অবসর নেওয়া মেসিকে নিয়েই দল ঘোষণা আর্জেন্টিনার

১০

সুন্দরবনে ফের এক জেলে অপহৃত, কাটছে না আতঙ্ক

১১

ইরান যুদ্ধের লাগাম টানতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

১২

হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু, নতুন রোগী ১৩২০

১৩

মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা

১৪

ডেঙ্গুতে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি নতুন রোগী ১৭৫৩

১৫

৩ মেট্রোরেলসহ একনেকে ১২ প্রকল্প অনুমোদন

১৬

শ্যামনগরে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় কর্মশালা

১৭

তালায় ভেজাল সার-কীটনাশক মজুদ, ব্যবসায়ীর জেল-জরিমানা

১৮

মেডিকেল-ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা হতে পারে ৪ ডিসেম্বর

১৯

সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বাড়তি বোনাস নিয়েছেন ১১৬ কোটি টাকা, ফেরত দেওয়ার নির্দেশ

২০
error: Content is protected !!