বাংলাদেশ, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৩:১২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ডাকসু ২০২৫: তরুণদের ভোটে নতুন সমীকরণ || কাউছার আহমেদ

১.
বহুল প্রতীক্ষিত এবং উত্তেজনার তুঙ্গে থাকা ডাকসু নির্বাচন-২০২৫ সমাপ্ত হয়েছে। নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৮ টি পদের মধ্যে ২৩ টিতে জয়লাভ করেছে তারা৷ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আত্মপ্রকাশের পর প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করেছে তারা৷ নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছাত্রদলের আবিদ-হামিম-মায়েদ প্যানেল ছিলো তাদের থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে৷

ইসলামী ছাত্রশিবির প্যানেলের এই সাফল্যের পিছনের কারণ এবং ভবিষ্যত জাতীয় রাজনীতিতে ডাকসু নির্বাচনের প্রভাব নিয়েই এই লেখা৷

২.
ইসলামী ছাত্রশিবির তার নেতাদের গ্রুমিং করা শুরু করে ক্লাস নিম্ন মাধ্যমিকে পড়াকালীন থেকেই। সেই সময় থেকেই তাদের ছোট ছোট পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড হাতে কলমে শেখানো হয় সেই সময় থেকেই। এরপর যত বয়স বাড়ে মেধা ও প্রজ্ঞা অনুসারে আরো বড় দায়িত্বে আসে৷ আজকে ডাকসুর ভিপি জিএস এই দীর্ঘকালীন গ্রুমিংয়ের ফল৷
অপর দিকে, অন্যান্য প্রচলিত ডান বা মধ্য পন্থার ছাত্র সংগঠনগুল, গ্রুমিং তো দূরে থাক, তাদের কর্মীদের রাজনীতির ময়দানে পা রাখার পর থেকে প্রতিটি পদে পদে সীমাহীন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয় কর্মী থেকে নেতা হতে গেলে। তাদের সিংহভাগ নেতা ই নেতা হন আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। কারো কারো অতীতে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা থাকে তবে সংখ্যাটা কম। তাছাড়া তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে পাওয়ার পলিটিক্স। কিন্তু শিবিরের বিষয়টি এমন নয়৷ শিবিরের প্রতিটি নেতৃত্ব একেকটি ফুল প্যাকেজ৷ নেতা হওয়া ছাড়াও তাদের একাডেমিক ক্ষেত্রেও চমৎকার ফলাফল করার সুনাম রয়েছে৷ এক্সট্রা-কারিকুলার এক্টিভিটিজে তাদের দক্ষতার প্রমাণ মেলে। নেতৃত্বগুণের পার্থক্য এখানেই হয়ে যায়৷

৩.
শিবির এতদিন মূলধারায় রাজনীতি করার সুযোগই পায় নি৷ সীমাহীন ট্যাগিংয়ের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে৷ রাষ্ট্রীয় মদদে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে৷ বছরের পর বছর এই ট্যাগিং দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যেহেতু মূল ধারায় তারা রাজনীতি করে নি তাই তাদের দোষ ত্রুটি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল নন শিক্ষার্থীরা৷ তাই তাদেরকে ক্ষমতায়িত করার একটা
ফ্যাসিনেশন ছিলো শিক্ষার্থীদের ৷ তাছাড়া অভ্যুত্থান পরবর্তী গত এক বছরে তাদের কার্যক্রমও চমৎকার, পরিশীলিত এবং সংযমী। এছাড়াও আল জাজিরার ডকুমেন্টারিতে সাদিক কায়েমের সাক্ষাৎকার এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট, খ্যাতনামা সাংবাদিকদের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তার অবদানের স্বীকৃতি, পরিমিতিবোধ সাদিকের ইমেজকে জনপ্রিয় করেছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।
৪.
ডাকসুতে শিবিরের প্রার্থী একরকম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো আরো এক বছর আগেই। এই এক বছরে জামাত শিবির একত্রে তাদের ফোকাস করেছে৷ বড় বড় প্রোগ্রামে তাদের বক্তব্য দিতে দিয়েছে। মিডিয়াতে পদচারণা ছিলো। ক্যাম্পাসে সভা সেমিনার করেছে৷ সাইন্স ফেয়ার, জুলাই বিষয়ক প্রোগ্রাম তারা করেছে। এ সবকিছুই তারা ডাকসুকে টার্গেট করে করেছে। অপরদিকে, ছাত্রদলের আবিদ বলেছে, সে ২০ দিন সুযোগ পেয়েছে প্রচারণার জন্য৷ তারা আজ থেকে এক মাস আগেও জানতো না তারা প্রার্থী হবে। শেষ পর্যন্ত দল থেকে সমর্থন পেয়ে তারা চেষ্টা করেছে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে৷ কিন্তু এটা যথেষ্ঠ হয় নি। শুধু ড্যামেজ কন্ট্রোলই হয়েছে। এক বছরের পরিকল্পিত প্রচারণার সামনে ২০ দিনের ইস্যুভিত্তিক প্রচারণা টিকতে পারে নি৷

৫.
এজিএস প্রার্থী মায়েদ ওপেন টকশো তে একজনকে শিবির ট্যাগ দিয়ে নিজের ইমেজ খুইয়েছে ৷ এছাড়াও ছাত্রদলের অনেকেই ট্যাগিং করেছে৷ এটার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাউকে পাকিস্তানি বা রাজাকার ট্যাগ দেওয়া পছন্দ করছে না শিক্ষার্থীরা। অপরপক্ষে, শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা কাউকে কোনো ট্যাগিং করে নি৷ প্রয়োজনও পড়ে নি। তবে তাদের নিচের লেয়ারে অনেক সমর্থক তাদের পক্ষে অনলাইনে লড়েছে। এক্ষেত্রে ট্যাগিং, বুলি করেছে। ৬.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সচরাচর এস্টাবলিশের বিরুদ্ধে থাকে৷ তারা জানে সামনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে৷ তাদের মনে এখনো রয়েছে গণরুম, গেস্টরুমের দুঃসহ স্মৃতি। তাই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আশু ক্ষমতাসীনদের শক্তিশালী করতে চায় নি৷ যে কারণে তারা ছাত্রদলকে বাদ দিয়ে শিবিরকে বেছে নিয়েছে৷
৭.
শিবিরের প্রচারণার কৌশল ছিলো খুবই মেটিকুলাস। সাদিক কায়েম প্রচারণার শুরুতেই বলেছে নারী শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সমর্থন দিচ্ছে তাদের। এটা একটা চমৎকার কৌশল ছিলো। নারী শিক্ষার্থীরা ছিলো তাদের টার্গেটেভ ভোটার। এজন্যই তারা নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়েছে৷ ফলাফল হাতে নাতে পেয়েছে৷ এমন কৌশলের ঘাটতি ছিলো ছাত্রদলের।
৭.
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবার আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। বেশ ভালো পরিমাণে ভোটও পেয়েছে তারা৷ শিবিরের নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে৷ স্বতন্ত্ররা তাদের ভোট নিতে পারে নি৷ স্বতন্ত্ররা মূলত সুইং ভোটগুলো নিজেদের দিকে নিয়েছে৷ এখানেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছাত্রদল।তাছাড়া শিবিরের প্যানেলে বৈচিত্র্যতাও শিবিরকে উদার সংগঠন হিসেবে দেখাতে চেয়েছে এবং অনেকাংশে সফলও হয়েছে৷ একই সাথে বাম দলগুলো প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে৷ তবে তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের এক ধরণের বিশ্বাসহীনতা রয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, বামদের ভিপি প্রার্থী ভোট পেয়েছে মোটে ৬৮ টি আর জিএস প্রার্থী ভোট পেয়েছে ৫ হাজারের উপর৷ একটা প্যানেলে ভিপি জি এসের ভোটের ব্যবধান এত হওয়া অনেকটাই অস্বাভাবিক। এসব কারণেই বামদের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়তে পারে ভবিষ্যতে। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে শুরুতেই তাদের ছিলো লেজে গোবরে অবস্থা। সেখান থেকে তারা আর বের হতে পারে নি৷ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে নি ছাত্র অধিকারের নেতারাও৷

আগামী জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর প্রভাব 
ডাকসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা নির্বাচন হলেও সারা দেশের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছিলো। রাজনৈতিক দলগুলোও তাই ডাকসুকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলো। ডাকসুর আলাপ পৌছেছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া, ইনফ্লুয়েন্সার, অনলাইন এক্টিভিস্টরা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে জনমত গঠনে৷ ভবিষ্যতেও তারা একটা বড় ভূমিকা রাখবে। সাধারণ মানুষের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও অনেক৷ তাই বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর প্রভাব থাকবে মূলত মধ্যবিত্তদের উপর যাদের হাতে একটা স্মার্টফোন আর একটা ফেসবুক আইডি আছে। তাদের মগজে বিভিন্ন ন্যারেটিভ ঢোকানোর চেষ্টা করবে এই সোশ্যাল মিডিয়া এক্টিভিস্টরা৷ তাই তাদের উপরে এর প্রভাব পড়বে। তবে
একদম প্রান্তিক পর্যায়ে যাদের হাতে ইন্টারনেট এক্সেস নাই তাদের উপর ডাকসুর প্রভাব হয়তোবা অতটা থাকবে না।

লেখক: প্রভাষক, আইন বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারতের উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব

১

ঘূর্ণিঝ‌ড়ের সতর্কবার্তার ম‌ধ্যে আশাশুনিতে খোল‌পেটুয়া নদীর বাঁ‌ধে ভয়াবহ ভাঙন, এলাকায় আতংক

২

ডিবি গার্লস হাইস্কুলে লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস পালিত

৩

‎সবুজের সান্নিধ্যে মন ও প্রাণের নিরাময় || ‎তারিক ইসলাম

৪

এবি পার্টি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শাখার আহবায়ক কমিটির অনুমোদন

৫

কয়রা উপজেলা প্রেসক্লাবের নিন্দা

৬

আশাশুনিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ প্রস্তুতি মেলা

৭

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যপুস্তকে ‘খেলাধুলা’ বই বাধ্যতামূলক হচ্ছে

৮

কয়রায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণতান্ত্রিক সংলাপ

৯

পাইকগাছার চাঁদখালীতে পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণে স্থান নির্ধারণ

১০

সাতক্ষীরা সীমান্তে মাদকসহ সাড়ে ৭ লাখ টাকার পণ্য জব্দ

১১

বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া, প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

১২

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির নতুন সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা

১৩

মারা গেলেন ‘সিআইডি’ খ্যাত জনপ্রিয় অভিনেতা

১৪

ব্যালন ডি’অরে কে কোন পুরস্কার জিতলেন

১৫

দেবহাটায় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

১৬

পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি, থানায় অভিযোগ

১৭

তারেক রহমানকে নিয়ে স্ট্যাটাসে যা বললেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী

১৮

আমন ক্ষেত ফেটে চৌচির, ফলন বিপর্যয়ের শংকা

১৯

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ শিক্ষার্থী কল্যাণ পরিষদের কমিটি গঠন

২০